সরকারি অর্থে সড়ক সংস্কারের কাজ। শুরুতেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ওঠায় কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, নিম্নমানের সেই উপকরণ পুরোপুরি সরিয়ে না নিয়েই আবারও কাজ শুরু করা হয়েছে। এতে প্রকল্পের কাজের মান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
ঘটনাটি নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার বাবুরহাট জিসি-ডালিয়া আরএইচ সড়ক ভায়া শুটিবাড়ি সড়ক সংস্কার প্রকল্পের।
গত ২২ সেপ্টেম্বর সড়কটির সংস্কারকাজ পুনরায় শুরু হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, আগের মতোই রাবিশ মিশ্রিত খোয়া, ভাঙা ইটসহ নিম্নমানের সামগ্রী কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গ্রামীণ সড়ক মেরামত ও সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় সময়ান্তর রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পের অধীনে সড়কটির সংস্কারকাজ নেওয়া হয়। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ২ কোটি ২৪ লাখ ৯৬ হাজার ৩১৫ টাকা। আর চুক্তিমূল্য ২ কোটি ১৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৯ টাকা ২৫ পয়সা।
কাজটি পেয়েছে নীলফামারী সদরের মসজিদপাড়া এলাকার মেসার্স সিদ্দি ইঞ্জিনিয়ারিং মার্কস। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. মাহফুজার রহমান সাদ্দাম।
কার্যাদেশ অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি কাজ শুরু হয়ে ১৮ মে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি। এরই মধ্যে কাজের শুরুতে ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অভিযোগ দেখা দেয়।
অভিযোগের পর ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান এবং এলজিইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সড়কটি পরিদর্শন করেন। স্থানীয়দের দাবি, পরিদর্শনের সময় নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের বিষয়টি উঠে আসায় সেগুলো সরিয়ে নিয়ে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ, সেই নির্দেশের পরও সড়কের পাশে থাকা নিম্নমানের খোয়া, রাবিশ ও ভাঙা ইট পুরোপুরি অপসারণ করা হয়নি। বরং এসব উপকরণ ব্যবহার করেই পুনরায় সংস্কারকাজ শুরু করা হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পুরোনো ও ক্ষতিগ্রস্ত কার্পেটিং তুলে নতুন করে সংস্কারের প্রস্তুতি চলছে। কয়েকটি স্থানে রাবিশ মিশ্রিত খোয়া দিয়ে বেজ তৈরির কাজ করতে দেখা যায়। পাশাপাশি সড়কের দুই পাশের রেজিংয়ের কাজে ভাঙা ও নিম্নমানের ইট ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন পর সড়কের সংস্কারকাজ শুরু হওয়ায় তারা স্বস্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু কাজের মান নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর তা বন্ধ করা হলেও একই ধরনের সামগ্রী দিয়ে আবার কাজ শুরু হওয়ায় এলাকাবাসী হতাশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ শুরুর পর থেকেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল। পরবর্তীতে কর্মকর্তারা পরিদর্শন করলেও নিম্নমানের সামগ্রী অপসারণ ও মানসম্মত উপকরণ নিশ্চিত করার বিষয়টি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে, তা নিয়ে তাদের সন্দেহ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এলজিইডি নীলফামারীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শামীম আখতার। তিনি বলেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর নিম্নমানের সামগ্রী সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে ভালো মানের নতুন নির্মাণসামগ্রী দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
একই দাবি করেন ডিমলা উপজেলা প্রকৌশলী মো. মফিজুর রহমান। তিনি বলেন, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অনিয়ম ধরা পড়ায় আগের মালামাল সরিয়ে নতুন মানসম্মত সামগ্রী সরবরাহ করে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ও কর্মকর্তাদের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্যের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, কাজ বন্ধ হওয়ার পর পুনরায় চালুর আগে ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষা, পুরোনো উপকরণ অপসারণ এবং কাজের গুণগত মান যাচাইয়ের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছিল কি না।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের মান যাচাই করলেই হবে না; প্রকল্পের তদারকি ও মাননিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকারও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এজন্য ব্যবহৃত খোয়া ও ইটের গুণগত পরীক্ষা, কাজের পরিমাণ ও পরিমাপ বই, বিল-ভাউচার এবং আগের পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এলাকাবাসীর আশঙ্কা, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে কাজ শেষ করা হলে বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও সড়কটি টেকসই হবে না। তাই প্রকল্পটির কাজের প্রতিটি ধাপ যাচাই, নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান পরীক্ষা এবং অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

