১৬ জুলাই, ২০২৬
সবুজ মাঠের লড়াই, গ্যালারির গর্জন আর গোল উদযাপনের উল্লাস—ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে ফুটবল বিশ্বকাপ এক পরম আনন্দের মহোৎসব। কিন্তু হাজার মাইল দূরে চলা সেই খেলার উন্মাদনা যখন বাংলাদেশের বুকে ডেকে আনে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ আর নির্মম হত্যাকাণ্ড, তখন আনন্দের সেই উৎসব মুহূর্তেই ঢেকে যায় বিষাদের কালো মেঘে। লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা কিংবা ইউরোপের পরাশক্তিদের সমর্থনকে কেন্দ্র করে এ দেশের তরুণ ও যুবসমাজের মাঝে গড়ে ওঠা অন্ধ উগ্রতা এখন আর কেবল কথার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; তা রূপ নিয়েছে প্রাণঘাতী সহিংসতায়।
ফুটবল বিশ্বকাপের মতো একটি বিনোদনমূলক বিষয়কে কেন্দ্র করে এই রক্তারক্তি ও হিংস্রতা আজ সমাজচিন্তকদের যেমন ভাবিয়ে তুলছে, তেমনই ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে করিয়ে দিচ্ছে আজ থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ({সা.})-এর করে যাওয়া এক অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণী।
উন্মাদনার আড়ালে নির্মমতার বাস্তবতা
প্রতিটি ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশে প্রিয় দল বা প্রিয় তারকাকে (যেমন মেসি-নেইমার) কেন্দ্র করে যে উন্মাদনা তৈরি হয়, তা অনেক সময়ই মাত্রাতিরিক্ত রূপ নেয়। আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের হার-জিত কিংবা তর্কের জেরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবেশীর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে প্রাণ হারিয়েছে তরতাজা তরুণ প্রাণ।
অথচ যে দেশগুলোর খেলা নিয়ে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, সেই লাতিন আমেরিকার খেলোয়াড়রা হয়তো জানেনই না যে সুদূর বাংলাদেশে তাদের সমর্থনের নামে এমন আত্মঘাতী উন্মাদনা চলছে। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, সুস্থ বিনোদনকে যখন অন্ধ মোহে রূপ দেওয়া হয়, তখন মানুষের যৌক্তিক চিন্তাভাবনা লোপ পায়। আর এই অন্ধ অনুকরণ ও পক্ষপাতের শেষ পরিণতি দাঁড়ায় চরম সহিংসতায়।
রাসুল ({সা.})-এর ভবিষ্যদ্বাণী ও বর্তমানের মিল
এই সমসাময়িক অবক্ষয় ও অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্বে জড়িয়ে প্রাণহানির চিত্র দেখে ইসলামি চিন্তাবিদ ও গবেষকেরা রাসূলুল্লাহ ({সা.})-এর একটি বিখ্যাত হাদিসের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।
হযরত আবু হুরায়রা ({রা.}) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ({সা.}) বলেছেন:
"ততদিন পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতদিন না ‘হারাজ’ (হত্যাকাণ্ড) বৃদ্ধি পাবে।" সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! ‘হারাজ’ কী? তিনি বললেন, "হত্যাকাণ্ড, হত্যাকাণ্ড।" (সহীহ মুসলিম)
অন্য একটি হাদিসে রাসুল ({সা.}) আরও স্পষ্ট করে বলেছেন যে, শেষ জামানায় এমন এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে যখন মানুষ বুঝতেও পারবে না সে কেন অন্যকে হত্যা করছে, আর নিহত ব্যক্তিও জানবে না কেন তাকে হত্যা করা হলো।
হযরত আবু হুরায়রা ({রা.}) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ({সা.}) বলেছেন:
"সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! মানুষের কাছে এমন একটি সময় অবশ্যই আসবে, যখন হত্যাকারী জানবে না সে কেন হত্যা করল এবং নিহত ব্যক্তিও জানবে না কেন তাকে হত্যা করা হলো।" (সহীহ মুসলিম)
আজকের প্রেক্ষাপটে এই হাদিসগুলোর বাস্তবতা যেন আমাদের চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠছে। হাজার মাইল দূরের একটি ফুটবল ম্যাচের জয়-পরাজয়ের মতো অতি তুচ্ছ ও অর্থহীন কারণে যখন একজন মানুষ অন্য মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, তখন সেই ঘাতক নিজেও হয়তো অনুধাবন করতে পারে না যে কত বড় মূর্খতা ও অন্ধ মোহের বশে সে এই মহাপাপটি করে ফেলল। আর যে প্রাণটি হারিয়ে গেল, সেও পরপারে পাড়ি জমাল এক চরম অর্থহীনতার বলি হয়ে।
অবক্ষয়ের মূলে "অন্ধ আনুগত্য" ও "আসাবিয়্যাহ"
ইসলামী স্কলারদের মতে, বিশ্বকাপ খেলাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই মারামারি ও হানাহানি মূলত জাহেলী যুগের উগ্র সাম্প্রদায়িকতা বা "আসাবিয়্যাহ" (গোত্রপ্রীতি বা অন্ধ পক্ষপাতিত্ব)-এর আধুনিক রূপ। রাসুল ({সা.}) উগ্র পক্ষপাতিত্বের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন:
"যে ব্যক্তি অন্ধ পতাকাতলে (উগ্র বা অযৌক্তিক পক্ষপাতে) যুদ্ধ করে, ক্রোধ প্রকাশ করে বা কোনো গোষ্ঠীর দিকে আহ্বান জানায় অথবা গোষ্ঠীর বিজয়ের জন্য লড়ে এবং ওই অবস্থায় নিহত হয়—তার মৃত্যু হবে জাহেলিয়াতের মৃত্যু।" (সহীহ মুসলিম)
অন্য দেশের জাতীয় পতাকাকে কেন্দ্র করে নিজের দেশের ভাইয়ের বুকে আঘাত করা এই জাহেলী উগ্রতারই প্রকাশ।
উত্তরণের পথ কী?
সমাজবিজ্ঞানী ও ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ:
পারিবারিক সচেতনতা: সন্তানদের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহকে সুস্থ বিনোদনের সীমারেখায় রাখা এবং অন্ধ মোহে রূপ নেওয়া থেকে বিরত রাখা পরিবারের প্রধান দায়িত্ব।
মূল্যবোধের শিক্ষা: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে পরমতসহিষ্ণুতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং জীবনের প্রকৃত গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা।
আইনের কঠোর প্রয়োগ: খেলাধুলার নামে যেকোনো ধরনের সহিংসতাকে কঠোর হস্তে দমন করা এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা।
উপসংহার
ফুটবল কেবলই একটি খেলা ও বিনোদন, তা কখনোই কোনো মানুষের অমূল্য জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না। হাজার মাইল দূরের গোলপোস্টের বল জড়ানোর উল্লাস যেন আমাদের ঘরের প্রদীপ নিভিয়ে না দেয়। রাসুল ({সা.})-এর সতর্কবাণী আমাদের জন্য কেবল আশঙ্কার বার্তা নয়, বরং তা এই অন্ধকার থেকে আত্মশুদ্ধি ও সঠিক পথে ফিরে আসার এক পরম দিকনির্দেশনা। সময়ের দাবি, আমরা যেন এই অন্ধ উন্মাদনা পরিহার করে সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে মনোযোগী হই।

