ঢাকায় নিখোঁজ হওয়ার ২০ দিন পর টাঙ্গাইলের গোপালপুরের কলেজছাত্র রাকিবুল ইসলাম (১৯)-এর মাটিচাপা মরদেহ নীলফামারীর ডিমলা থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, ঢাকার একটি ভাড়া বাসায় হত্যার পর রাকিবের মরদেহ কার্টনে ভরে রাতের আঁধারে ডিমলায় এনে বাড়ির পাশে মাটিচাপা দেওয়া হয়।
হত্যার ঘটনা গোপন রাখতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাকিব জীবিত আছেন—এমন একটি ভিডিও তৈরি করা হয়। পরে ওই ভিডিও পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠিয়ে ভয়ভীতি দেখানোর পাশাপাশি চার লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
এ ঘটনায় আব্দুল্লাহ আল মামুন (২৩) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও দুজনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি তদন্তে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আব্দুল্লাহ মামুনকে ‘শিবিরকর্মী’ হিসেবে উল্লেখ করে বিভিন্ন ফেসবুক পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এ দাবি নাকচ করেছেন ডিমলা উপজেলা শিবিরের সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, ‘কোনো ঘটনা ঘটলেই একটি গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শিবিরের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে অপপ্রচার চালানো হয়েছে, । অভিযুক্ত আব্দুল্লাহ মামুন কখনোই শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না।এ দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্য মূলক।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাকিবুল ইসলাম টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার উদ্দোমপুর দক্ষিণপাড়া গ্রামের খাদেমুল ইসলামের ছেলে। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য তিনি ঢাকায় যান। গত ১ আগস্ট রাজধানীর কাফরুল থানার শেওড়াপাড়ার একটি মেসে ওঠেন রাকিব।
সেখানে অনলাইনের মাধ্যমে ডিমলার বালাপাড়া ইউনিয়নের ছাতনাই বালাপাড়া বসুনিয়াপাড়া গ্রামের আফসার আলীর ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামুন ধানমন্ডি এলাকায় রিনা নামের এক নারীর ভাড়া বাসায় থাকতেন এবং অনলাইনে কসমেটিকসের ব্যবসা করতেন। ওই বাসায় রাকিবের নিয়মিত যাতায়াত ছিল।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, গত ১৬ আগস্ট মামুনের ওই ভাড়া বাসায় গেলে রাকিবের সঙ্গে কোনো একটি বিষয় নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পরে মরদেহ একটি কার্টনে ভরে ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতের আঁধারে সেটি ডিমলায় এনে মামুনের বাড়ির পাশে মাটিচাপা দেওয়া হয় বলে পুলিশের দাবি।
এদিকে রাকিব নিখোঁজ হওয়ার পর তার বড় ভাই জহুরুল ইসলাম জীবন কাফরুল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। নিখোঁজের রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তাকে অপহরণ করে আটকে রাখার বিষয়টি সামনে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৫ অক্টোবর কাফরুল থানায় অপহরণ মামলা করা হয়।
মামলা হওয়ার দিনই ঢাকার ধানমন্ডির একটি ভাড়া বাসা থেকে আব্দুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য যাচাই করতে পুলিশ তাকে নীলফামারীর ডিমলায় নিয়ে আসে।
মামুনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া এলাকায় অভিযান চালায় কাফরুল থানা ও ডিমলা থানা পুলিশ। পরে তার দেখানো স্থান থেকে মাটির নিচে চাপা দেওয়া অবস্থায় রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
কাফরুল থানার এসআই ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র রায় বলেন, ‘‘রাকিবের বড় ভাই প্রথমে নিখোঁজের ঘটনায় জিডি করেছিলেন। পরে অপহরণ মামলা হলে মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্য যাচাই করে ডিমলার বালাপাড়া এলাকা থেকে রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।’’
পুলিশ আরও জানায়, হত্যার পর রাকিবের পরিবারকে বিভ্রান্ত করতে প্রযুক্তির আশ্রয় নেওয়া হয়। এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে রাকিব জীবিত আছেন—এমন একটি ভিডিও তৈরি করে সেটি পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়। ওই ভিডিও ব্যবহার করে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়েছে বলে তদন্তে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
জিজ্ঞাসাবাদে মামুন আরও দাবি করেছেন, মুক্তিপণের টাকা তিনি একা নেননি। দিনাজপুরের রতন ও নুর জামাল নামে আরও দুজন এ ঘটনায় জড়িত এবং তাদের মধ্যে টাকা ভাগ হয়েছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং তাদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রাকিবকে কোথায় এবং কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, মরদেহ ঢাকার বাইরে নিয়ে আসার সময় কারও সহযোগিতা ছিল কি না, এআই ভিডিওটি কার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল এবং মুক্তিপণের টাকা কীভাবে লেনদেন হয়েছে—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে ডিমলার বালাপাড়া এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের মধ্যেও ঘটনাটি নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
ডিমলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশরাফুল ইসলাম বালাপাড়া ইউনিয়নের ছাতনাই বালাপাড়া এলাকা থেকে মাটিচাপা অবস্থায় রাকিবের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

